প্রশ্ন কর্তার নাম : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

উত্তর: আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ,

মাসিকে পুষ্টিকর খাবার
মাসিক, শব্দটির সাথে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর প্রত্যেক মেয়ের জীবনেই এটি হয়ে থাকে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নিয়মে। প্রথম মাসিকের অভিজ্ঞতা হবার পর থেকে, ধীরে ধীরে মাসিক মেয়েদের জীবনের একটা অংশ হয়ে যায়। তাই বিষয়টি শরীরের উপর কতোটা প্রভাব ফেলছে, অনেক সময় সেটা আপনি নিজেও বুঝতে পারেন না।
মাসিকচক্র একটি নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত সমস্যার সাথে সম্পর্কিত। পুষ্টি উপাদানটি হলো, আয়রন। আয়রন রক্তের একটি অন্যতম উপাদান। তাই সব ধরণের রক্তপাতেই আয়রনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যেহেতু মাসিকের সময় প্রতিমাসে শরীর থেকে বেশকিছু রক্ত বের হয়ে যায়, তাই যেকোন মেয়ের শরীরে আয়রনের অভাবজনিত সমস্যা হতে পারে; যদি মাসিক চলাকালীন সঠিক মাত্রায় খাবার গ্রহনের মাধ্যমে, পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত না করা হয়।
মানুষের শরীর থেকে যে পরিমান আয়রন বের হয়, খাবার গ্রহণের মাধ্যমে সেই পরিমান আয়রন শরীরে প্রবেশ না করলে এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আর আয়রনের ঘাটতির কারণে অ্যানিমিয়া হয়ে থাকে। যা আপনার রক্তে স্বাস্থ্যকর ব্ল্যাড সেল তৈরীতে বাধা দেয়। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৪২ ভাগ নারীর রক্তে আয়রনের ঘাটতি আছে, যা অ্যানিমিয়ার লক্ষণ। অর্থাৎ প্রতি ১০ জন মেয়ের মধ্যে ৪ জন অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতার শিকার।
মাসিকের সময় যাদের অনেক বেশি রক্তপাত হয়, তাদের অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি থাকে। যাদের কম কিংবা মাঝারি ফ্লো থাকে, তাদের প্রাকৃতিকভাবেই আয়রন এর লেভেল ঠিক হয়ে যায়। আপনার ফ্লো বেশি হচ্ছে না কম, সেটা জানতে দিনে কতোবার প্যাড, কাপড় বা ট্যাম্পুন বদলাতে হচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখুন। ঘন্টায় ঘন্টায় যদি প্যাড বদলাতে হয়, তার মানে আপনার রক্তপাত বেশি হচ্ছে। এর পাশাপাশি কিছু লক্ষণ আছে যা দেখে আপনি বুঝবেন আপনার শরীরে আয়রনের পরিমান কমে যাচ্ছে কিনা, আপনি অ্যানিমিয়ার দিকে এগোচ্ছেন কিনা!
অ্যানিমিয়ার অন্যতম লক্ষণ গুলো হলো-
অবসাদ, দুর্বলতা, ক্লান্তি, চোখে ঝাপসা দেখা, মাথা ঝিমঝিম করা, মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, খাবারে অরুচি, অমনযোগী হওয়া, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া, জিহ্বা ও মুখে ব্যথা, ভঙ্গুর নখ, জ্বর, বমি ইত্যাদি।
এই লক্ষণগুলোর যেকোনটা দেখা দিলে, ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া দরকার। কখনো কখনো একটা অষুধই পারে আপনার সব সমস্যার সমাধান করে দিতে, আবার কখনো সমস্যা বাড়তে দিলে দেরি হয়ে যায় সমাধানে পৌঁছাতে। তাই, ডাক্তারের কাছে যাবার আগে এবং অসুখকে বাড়তে দেয়ার আগে নিজে সচেতন থাকাটা সবচেয়ে ভালো।
এক্ষেত্রে সবার আগে খেয়াল রাখতে হবে আপনার খাবার তালিকার দিকে। এ সময় নিজেকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে কিছু খাবার গ্রহণ বেশ জরুরি।
আয়রন সমৃদ্ধ খাবার
যেসব খাবারে প্রচুর আয়রন পাওয়া যায় মাসিকের সময় তা নিয়মিত খাবার চেষ্টা করতে হবে। যেমন: মাছ, মাংস, ডিম, কলিজা, কচু শাক, পুঁই শাক, ডাঁটা শাক, ফুলকপির পাতা, ছোলা শাক, ধনে পাতা, তরমুজ, কালো জাম, খেজুর, পাকা তেঁতুল ও আমড়া এই খাবারগুলো শরীরের আয়রনের ঘাটতি পূরণ করে
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল
শরীরে আয়রনের ঠিকমত শোষণ ও যথাযথ কার্যকারিতার জন্য ভিটামিন সি খুব জরুরি। এ কারনে মাসিকের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন সি খাওয়া প্রয়োজন। বেশ কিছু পরিচিত ফলে প্রচুর ভিটামিন সি পাওয়া যায়। যেমন:  পেয়ারা, আমড়া, আমলকি, লেবু, জলপাই, জাম্বুরা, পাকা টমেটো, কামরাঙা, পাকা পেঁপে, আনারস ইত্যাদি
পানি
মাসিকের সময় রক্তপাতের পাশাপাশি শরীর থেকে অনেক খানি তরল বেরিয়ে যায়। এই অভাব পূরণ করার জন্য এ সময় প্রচুর পানি পান করতে হবে। এসময় দিনে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, চা, কফি, কোমল পানীয় ইত্যাদি দিয়ে এই ঘাটতি পূরণ হয় না। সাধারণ পানিই শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতে সব চাইতে বেশি কার্যকর।  চাইলে, হালকা কুসুম গরম পানি পান করা যেতে পারে। এতে অনেক সময় পেট ব্যথা থাকলে আরাম পাওয়া যায়
বাদাম
বাদামে নানান রকম ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে। এগুলো মাসিকের সময় শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তবে লবণে ভাজা বা চিনি মেশানো বাদাম খাওয়া উচিত নয়। চীনা বাদাম, কাজু বাদাম, কাঠ বাদাম, পেস্তা ইত্যাদি

মাসিক বান্ধব টয়লেট
মাসিকের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাটা বেশ জরুরি। তার জন্য পরিষ্কার কাপড় বা প্যাড ব্যবহার করা, হাত ধোয়ার পাশাপাশি পরিষ্কার টয়লেট ব্যবহার করা প্রয়োজন। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বান্ধব টয়লেট বলতে এমন টয়লেট বোঝায় যাতে সাবান, পরিষ্কার পানি এবং প্যাড ফেলানোর বাক্স (ডিস্পোজাল)-এর ব্যবস্থা থাকবে। আবার টয়লেটে দরজা বা ছাদ না থাকলে তা মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়। মেয়েরা এই রকম টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অস্বস্তিতে পড়ে। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি এই বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা দরকার।
একটি মাসিকবান্ধব টয়লেটে নিচের বিষয়গুলো থাকা জরুরিঃ
•    পরিষ্কার পানি
•    পানির নিরাপদ উৎস
•    পানির অব্যাহত সরবরাহ
•    সাবান
•    ঢাকনাসহ ডাস্টবিন
•    গোপনীয়তা নিশ্চিতকরণ
•    নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ