স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মেয়েরা, লজ্জা-ভয়ে স্কুল ছাড়ছে

This content was developed for Bangladeshi Nationals.

নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া কিশোরী স্কুলে যাওয়ার পর একটু পরপর উসখুস করছিল। এক সময় সে অজ্ঞান হয়ে গেল। তারপর মারা গেল। পোস্টমর্টেম করার পর কিশোরীর জরায়ুতে দুটি সাপের বাচ্চা পাওয়া যায়। ঘটনাটি ঘটে ২০০৯ সালে। যশোরের ঝিকরগাছার ওই কিশোরীর মাসিক হয়েছিল। সে মাসিকের পুরোনো কাপড় শুকাতে দিয়েছিল কোনো স্যাঁতসেঁতে জায়গায়। সেখান থেকেই হয়তো সাপের বাচ্চা দুটো কাপড়ে লাগে। কিন্তু স্কুলে গিয়ে অস্বস্তি হলেও কাউকে বলতে পারেনি সে কথা।

নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপের ১১ বছরের কিশোরী সানজিদা সুলতানার হঠাৎ পেটে ব্যথা। তারপর যোনিপথে রক্তের উপস্থিতি। আকস্মিক এ পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে সে। লজ্জায়-ভয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। আর মাসিকের কারণে নিয়মিত স্কুলে না যাওয়ায় লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় সুবর্ণচরের আরেক কিশোরী ছালেহা খাতুনের। শেষে মা-বাবার চাপে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে।

এরকম অসংখ্য কিশোরী মাসিক বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে মৃত্যুঝুঁকিসহ শিক্ষা গ্রহণ থেকে ছিটকে পড়ছে। দূরন্ত কৈশোরে স্কুল মানেই প্রিয় বন্ধু, ক্লাস রুম আর দিনভর আনন্দ। তবে কিশোরীদের কাছে মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এ স্কুলই বিষাদময় হয়ে ওঠে। কোনকিছুতেই তখন মন বসে না। আবার মন খুলে কাউকে বলাও যায় না এ অস্বস্তির কথা।

দেশের বেশিরভাগ স্কুল-কলেজের টয়লেট মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় উপযোগী নয়। নারী ও মেয়েদের মধ্যে স্যানিটারি প্যাডের ব্যবহার বাড়লেও মাসিকের সময় ব্যবস্থাপনায় রয়ে গেছে অনেক সমস্যা। স্কুলে পর্যাপ্ত পানি সরবারহের অভাব, পরিস্কার টয়লেটের ঘাটতি, গোপনীয়তার অভাব স্কুলগামী মেয়েদের জন্য এসময়টি আরো জটিল করে তোলে। এতে বাড়ছে স্কুলে মেয়েদের অনুপস্থিতির হার। সরকার স্কুলগুলোকে মাসিকবান্ধব করে তুলতে প্রজ্ঞাপন জারি করলেও বাস্তবতা ভিন্ন।

ওয়াটার এইডের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের ৮২ শতাংশ স্কুলে মাসিক ব্যবস্থাপনায় যথাযথ কোনো সুযোগ নেই। একারণে শিক্ষার্থী অনুপস্থিতির হারও বেশি থাকে।

অপরদিকে, ইউনিসেফ এর তথ্যানুযায়ী, জীবনের প্রথম মাসিকের অভিজ্ঞতা অনেক মেয়ের কাছেই ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা। কারণ এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য থাকে না, এমনকি মায়েরাও কন্যা সন্তানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন না।

২০১৪ সালের বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেসলাইন সার্ভে থেকে জানা যায়, দেশের ৪০ শতাংশ মেয়ে মাসিক ঋতুচক্রের সময়ে তিনদিন স্কুল যায় না এবং এই ৪০ শতাংশের তিনভাগের এক ভাগ মেয়ে জানিয়েছে, স্কুল কামাই দেওয়ার কারণে তাদের লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখনও মাত্র দশ শতাংশ নারী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে আর বাকী ৮৬ শতাংশ নারী ব্যবহার করে পুরাতন কাপড়। অপরদিকে, মাত্র ৬ শতাংশ মিন্সট্রুয়াল হাইজিন ম্যানেজমেন্ট সর্ম্পকে স্কুলে জানতে পারে। স্কুলে টয়লেটগুলোতে কাপড় পরিবর্তন করার সুযোগ ও ব্যবহৃত ন্যাপকিন ফেলার ব্যবস্থা না থাকা, মেয়েদের জন্য আলাদা কমনরুম না থাকা, মাসিকের রক্ত লেগে যাওয়ার ভয়, সহপাঠীরা টিজ করবে সেই লজ্জায় মাসিকের দিনগুলোতে স্কুলে যেতে এমনকি ঘর থেকে বের হতেও অস্বস্তিবোধ করে অনেক মেয়েই। অথচ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ছয় ঘণ্টা অন্তর ন্যাপকিন পাল্টানো দরকার। তা না হলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে এবং নানা রোগ দেখা দিতে পারে।

বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের মাসিক হওয়াটা স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় একটি প্রক্রিয়া। স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটিকেই সমাজে অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ বিষয় (ট্যাবু) হিসেবে ভাবা হয়। ফলাফল হিসেবে জরায়ুমুখ ও প্রজনন অঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ দেখা দেয়।

২০১৩ সালে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ওয়াটার এইড-এর সহায়তায় ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিস রিসার্চ, বাংলাদেশ’ বা আইসিডিডিআর,বি ৭০০ স্কুলের ২,৩৩২ জন ছাত্রীরও সাক্ষাৎকার নেয়। ছাত্রীদের ৬৪ শতাংশ জানায়, প্রথমবার মাসিক হওয়ার আগে তারা এ বিষয়ে জানত না। আর প্রায় ৮৬ শতাংশ জানায়, তারা মাসিকের সময় পুরোনো কাপড় ব্যবহার করে। দেখা যায়, বাংলাদেশের মাত্র ১ শতাংশ স্কুলে ব্যবহার করা প্যাড ফেলার ব্যবস্থা আছে। ওই জরিপে ৪১ শতাংশ ছাত্রী জানায়, মাসিকের কারণে গড়ে মাসে তারা তিনদিন স্কুলে যেতে পারে না।

স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম বেশি

বাজার ঘুরে দেখা যায়, দেশের প্রথম স্যানিটারি ন্যাপকিন ‘সেনোরা’। বর্তমানে মোনালিসা, ফ্রিডম, জয়া, স্যাভেলন এবং ইভানাসহ নানা ব্র্যান্ডের প্যাড পাওয়া যায়। প্রতিটি কোম্পানির স্যানিটারি ন্যাপকিনের মূল্য দরিদ্র শ্রেণির নারীদের সামর্থ্যওে বাইরে। এছাড়া সামর্থ্য থাকার পরও অনেকেই সচেতনতার অভাবে এর পেছনে অর্থ ব্যয় করতেও নারাজ।

প্যান্টি লাইনার প্যাড,আল্ট্রা-থিন প্যাড, রেগুলার প্যাড, ম্যাক্সি/সুপারপ্যাড, ওভারনাইট প্যাড, ম্যাটারনাল প্যাড; প্রতিটি ক্যাটাগরির স্যানিটারি ন্যাপকিন ১০০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি করা হয়।

এসএমসির বিপণন ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান বলেন, অনেকেই প্যাডের দামের ব্যাপারে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকার কথা বলছেন। কিন্তু ন্যাপকিন তৈরিতে ১২ থেকে ১৫টি কাঁচামাল দেশের বাইরে থেকে আসে। সেই কাঁচামাল কারখানা পর্যন্ত পৌঁছতে ৭০% শুধু ভ্যাট ও ট্যাক্স হিসেবে জমা দিতে হয়। তারপর এর প্রস্তুতকরণ, বাজারজাতকরণ ইত্যাদি বিষয় অতিক্রম করে ক্রেতার হাত পর্যন্ত পৌঁছে। এ কারণে ন্যাপকিনের দাম সবার সাধ্যের মধ্যে আনতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

মাসিক নিয়ে ভয়-লজ্জা

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার (ছদ্মনাম) বলেন, শরীর খারাপ (মাসিক) হলে খুব ভয় পাই। মুরব্বিরা বলেন, শরীরে খারাপ রক্ত থাকলে এভাবে বের হয়। রক্ত থেকে মাছের আঁশটে গন্ধ বের হবে, তাই মাছ-মাংস খাওয়াও বারণ। ঘর থেকে বের হতে না করে। মাসিক অপবিত্র এমন কথা বলে ঘরের কাজ করতে দেওয়া হয় না। মাসিকের সময় ব্যবহার করা কাপড় যাতে অন্যরা দেখতে না পায়, সে জন্য ঘরের অন্ধকার কোনে স্যাঁতসেঁতে জায়গায় শুকাতে হয়। সাবান দিয়ে ধুতে দেওয়া হয় না।

নাজিয়া পারভীনের (ছদ্ম নাম) জন্ম ও বেড়ে ওঠা রাজধানীর ধানমণ্ডিতে। ৩০ বছর বয়সী এই গৃহিণী বয়:সন্ধিকাল থেকেই পিরিয়ডের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেছেন। তবে কোনদিনই নিজে দোকানে গিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনেননি তিনি। বিয়ের আগে বাবা-মা এবং বিয়ের পরে স্বামীকে দিয়ে কেনাচ্ছেন।

এ তো গেল শহরের পরিস্থিতি। কিন্তু গ্রামে কি অবস্থা? তা জানতে কথা বলেছিলাম ঢাকার কাছে মুন্সীগঞ্জের স্বাস্থ্যকর্মী তাহমিনা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, মাসিক বা ঋতুশ্রাব বিষয়ক পরিচ্ছন্নতা প্রশ্নে গ্রামের নারীরা সমাজ ও লোকলজ্জার বাধা কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

দুই থেকে আড়াই বছর আগে উন্নয়নকর্মী ফেরদৌস আরা রুমী মিন্স্ট্রুয়াল হাইজিন নিয়ে কাজ করতে যান ভোলার চরফ্যাশনে। মাসিকের বিষয়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি দেখতে পান, তারা লজ্জা পাচ্ছে। এখনও হাইজিন টেন্ডেন্সি, ট্যাবু, লুকোচুরি- এসব কারণে মেয়েরা সচেতন না। তাদের অভিভাবকরাও সচেতন নন। সমাজে এখনও বিষয়টি একটি অচ্ছ্যুৎ বিষয়। এ সময়ে যে মেয়েদের পরিচর্যা, যতœ, পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন সেটি পরিবার জানেও না। মাসিকের সময়ে পরিচ্ছন্নতা বা নিরাপদ ব্যবস্থাপনা না থাকার অন্যতম কারণ সমাজের রক্ষণশীলতা।

আইসিডিডিআর,বি’র গবেষণা কর্মকর্তা ফারহানা সুলতানা বলেন, আমরা দেখেছি, এ নিয়ে মানুষের মধ্যে সংকোচ আছে, অজ্ঞতা আছে। লোকে এ নিয়ে কথা পর্যন্ত বলতে চায় না। স্কুলগুলোতে পিরিয়ড সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা একেবারেই নেই। এসব কারণেই মেয়েদের অনেক সময় দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।

ব্র্যাক এর সিনিয়র সাপোর্ট স্পেশালিস্ট বিথী রায় বলেন, মাসিক নিয়ে যে ট্যাবু আছে, সেটা ভাঙতে হবে। মাসিক বিষয়টি শুধু নারী বুঝলেই হবে না। পরিবারের সদস্য এবং সমাজকেও এটা বুঝতে হবে। এটাকে একটি স্বাভাবিক শারীরিক বিষয় হিসেকে জানতে হবে, মানতে হবে। তাহলে আর ভয় বা লজ্জা থাকবে না।

রেড অরেঞ্জ মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশনের হেড অব প্রোগ্রামস নকীব রাজীব আহমেদ বলেন, মাসিক নিয়ে সব বাধা দূর করতে ব্যাপক প্রচারণা ও সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। তাই এ জন্য সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস এর দুতাবাসের অর্থায়নে ঋতু প্রকল্প মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যাবস্থাপনা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ঋতু প্রকল্পে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সিমাভি লিড, রেড অরেঞ্জ মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশনস স্ট্র্যাটেজিক এন্ড কমিউনিকেশন পার্টনার, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গবেষণা সংস্থা টিএনও পার্টনার হিসেব আছে। এছাড়াও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন পার্টনার হিসেবে কাজ করছে বিএনপিএস এবং ডিওআরপি। মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যাবস্থাপনা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য এরকম আরও বহু প্রকল্প বাংলাদেশে প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

ওয়াটার এইডের পরিচালক (প্রোগ্রাম) হাসিন জাহান বলেন, বর্তমানে মেয়েদের নয় থেকে ১১ বছরের মধ্যেই মাসিক শুরু হচ্ছে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে কোনো কার্যক্রম নেই। এ স্তরের পাঠ্যপুস্তক কারিকুলামেও কিছু বলা হয়নি। তারা বিষয়টি নিয়ে যাতে কোনো ধরনের ট্রমার মধ্যে না পড়ে তার জন্য এই বয়সকে টার্গেট করে বিভিন্ন কার্যক্রম নিতে হবে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, মাসিক নিয়ে মেয়েদের সচেতন করার জন্য মা-বাবারাই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন। এ জন্য মাসিক নিয়ে সচেতনতামূলক কোনো অয়োজন হলে সেখানে অবশ্যই মা-বাবাকে সম্পৃক্ত করা দরকার। সমাজের বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিসহ সারা দেশের গ্রামের প্রতিনিধিদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতনতামূলক কাজ করতে হবে, যাতে মাসিক তাদের কাছে ভয় বা লজ্জার বিষয় না হয়। রাজধানীসহ দেশের সব অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় নারীবান্ধব টয়লেটের ব্যবস্থা করার জন্য সরকার ইতিমধ্যে কাজ করার পরিকল্পনা করছে বলেও জানান তিনি।

Source: https://samakal.com/bangladesh/article/1810507/%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%B2%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%AD%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%B2-%E0%A6%9B%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%9B%E0%A7%87

Leave a Reply

Your email address will not be published.