সুপ্রিম কোর্টে নেই পিরিয়ডকালীন টয়লেট ব্যবস্থা

This content was developed for Bangladeshi Nationals.

কর্মস্থলে নারীবান্ধব টয়লেট ব্যবস্থা না থাকায় পিরিয়ড চলাকালে অনেক কর্মজীবী নারী ওই সময়টাতে টয়লেটে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পরে থাকেন একই স্যানিটারি প্যাড। এতে করে তাদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্মস্থলে নারীবান্ধব টয়লেট ব্যবস্থা এখন শুধু প্রয়োজন নয় বরং এটা নারীদের অধিকারে পরিণত হয়েছে। অথচ কর্মক্ষেত্রে সে ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তারা। বাদ যাচ্ছেন না সুপ্রিম কোর্টের নারী আইনজীবী, কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা এখানে আসা নারী বিচারপ্রার্থীরাও।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে (আপিল ও হাইকোর্ট) লাইসেন্সধারী আইনজীবীর সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। এরমধ্যে নিয়মিত কোর্টে আসেন প্রায় দুই হাজার নারী আইনজীবী। এছাড়াও তাদের সঙ্গে জুনিয়র হিসেবে কাজ করেন সদ্য পাস করা শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীরা। এ ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসন ও দফতরে কর্মরত নারী কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নারী বিচার প্রার্থীরাও প্রতিদিন কোর্টে আসছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের বাইরে যারা কোর্ট ব্যবস্থা দেখে এসেছেন, তারা দেশের কোর্ট আঙিনায় টয়লেট ব্যবস্থাপনা দেখলে প্রথমেই ধাক্কা খান। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। কোর্টের অ্যানেক্স ভবনে নারীদের জন্য একটি টয়লেট রয়েছে। সেখানে আমি যতবারই যাই ততবারই দেখতে হয়, বাল্ব নেই, অন্যান্য উপকরণও অপ্রতুল। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতি ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি এবং মহিলাদের জন্য নির্ধারিত কমন রুমের পাশে আরেকটি টয়লেট রয়েছে। এ টয়লেটগুলোয় অধিকাংশ সময় প্রয়োজনীয় উকরণগুলো থাকে না এবং অপরিচ্ছন্ন থাকে। টয়লেটগুলো নারীদের জন্য সংরক্ষিত হলেও তার কোনোটাই পিরিয়ড চলাকালে ব্যবহার উপযোগী নয়।’

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘কোর্ট ভবনে যখন আমার কোনও মামলা শুনানির জন্য শুরু হতে যায়, তখন টয়লেট ব্যবহার করা আমার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠলে দীর্ঘ পথ হেঁটে আমাকে আইনজীবী সমিতি ভবনের টয়লেটে আসতে হয়। এরপর টয়লেট থেকে আবার কোর্ট রুম পর্যন্ত যেতে হয়। ততক্ষণে কোর্টে মামলার শুনানি শুরু হয়ে যায়। তাই টয়লেটের জন্য এত দূর যাওয়ার বিষয়টি সকল নারী আইনজীবীদের কাছেই বিরক্তিকর। প্রতিটি ভবনের প্রতি তলাতে এ ধরনের টয়লেট থাকা প্রয়োজন। নারীদের জন্য বিশেষ টয়লেট ব্যবস্থা নিয়ে আমি নিজেও কয়েকবার ভেবেছি। অনেক নারী আইনজীবী কোর্টের টয়লেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমার কাছে আপত্তি তুলেছেন। আমি নিজেও অনেকের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করেছি।’

ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, ‘টয়লেট ব্যবস্থা উপযুক্ত না হওয়ায় আমাদের নারী আইনজীবীদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা এখানকার টয়লেট ব্যবহার করেন না। তারা বাসায় চলে যান কিংবা কম পানি খেয়ে সকাল বেলা বাসা থেকে বের হন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হয়। এভাবে তো আর দীর্ঘদিন চলা যায় না। এমনকি পিরিয়ড চলাকালেও অনেক নারী আইনজীবীরা কোর্টে আসা থেকে বিরত থাকেন।’

পিরিয়ড চলাকালে নারীবান্ধব টয়লেট ব্যবস্থাপনা যেমন হওয়া চাই

পিরিয়ডকালে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রকল্প নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান রেড অরেঞ্জ মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনের হেড অব প্রোগ্রামস নকীব রাজীব আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পিরিয়ডকালে নারীবান্ধব টয়লেটে তাদের জন্য নিরাপদ পানি, সাবান, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও একটি ঢাকনাযুক্ত ঝুড়ি বা বিন থাকা জরুরি। এছাড়াও যদি টয়লেটে স্যানিটারি প্যাডের সরবরাহ সবসময়ের জন্য নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আমরা অবশ্যই সে টয়লেটকে পিরিয়ডকালে নারীবান্ধব টয়লেট বলতে পারবো।’

নকীব রাজীব আহমেদ আরও বলেন, ‘স্যানিটারি প্যাড পরিবর্তনের জন্য টয়লেটের জায়গাটিও প্রয়োজন অনুসারে বড় হওয়া দরকার। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, টয়লেটে শুধু বসার জায়গা ছাড়া আর কোনও স্থান থাকে না। তাই নারীদের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করে তাদের টয়লেটগুলো একটু বেশি জায়গা নিয়ে বিশেষভাবে নির্মাণ করা উচিৎ।’ পুরুষরা সচরাচর আসা-যাওয়া করেন, এমন স্থানে নারীদের জন্য টয়লেট স্থাপন না করাই ভালো বলে মনে করেন তিনি।

কর্মস্থলে নারীবান্ধব টয়লেট না থাকায় যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে

রিপ্রোডাকটিভ হেলথ সার্ভিসেস, ট্রেনিং অ্যান্ড এডুকেশন প্রোগ্রামের উপ-পরিচালক ডা. এলভিনা মোস্তারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কর্মস্থলে নারীদের জন্য একটি পিরিয়ডকালে ব্যবহার উপযোগী টয়লেট থাকা খুবই প্রয়োজনীয়। প্যাড পরিবর্তনের বিড়ম্বনার জন্য অনেকেই কর্মস্থলে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। আর যারা কর্মস্থলে যাচ্ছেন, তারাও ব্যবহার উপযোগী টয়লেট না পাওয়ায় একটি প্যাড দীর্ঘ সময় ব্যবহার করছেন। অথচ প্রয়োজন মাফিক কিংবা প্রতি ৬ ঘণ্টা পর স্যানিটারি প্যাড পরিবর্তন না করলে নারীদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগ-জীবানুর সৃষ্টি হয়। এর ফলে নারীর জরায়ুতে ফাঙ্গাল ইনফেকশন, চুলকানি, সাদাস্রাব, মূত্রনালীর সংক্রমণ (ইউটিআই) কিংবা তলপেটে প্রচণ্ড ব্যাথা হতে পারে। আর প্রাথমিক ওইসব সংক্রমণ থেকে নারীদের জরায়ু ক্যান্সার, বন্ধাত্য এমনকি শারীরিক বা মানসিক দিক থেকে স্থায়ী কোনও রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।’

সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার রিমি নাহরিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টসহ বেশ কিছু জেলা আদালত ও ট্রাইব্যুনালে আমাকে মামলা পরিচালনার জন্য প্রায়ই যেতে হয়। অথচ কোথাও আমি নারীবান্ধব টয়লেট দেখিনি। সুপ্রিম কোর্টের প্রতিটি তলায় নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক টয়লেট প্রয়োজন। এখানে কোর্ট রুম থেকে নারীদের জন্য নির্ধারিত কমন রুমের টয়লেটের দূরত্ব অনেক। তাই মামলা ছেড়ে টয়লেটে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।’

ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, ‘বাইরের দেশগুলোতে টয়লেটে নারীদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ ব্যবস্থা সংযুক্ত থাকতে দেখা যায়। সেখান থেকে কয়েন দিয়ে যে কেউ তার প্রয়োজনে ন্যাপকিন সংগ্রহ করতে পারেন। এগুলো তো আমাদেরও থাকা উচিৎ। কিন্তু, সেসব বিবেচনা না করায় সুপ্রিম কোর্টেও পিরিয়ডকালে ব্যবহার উপযোগী টয়লেট গড়ে ওঠেনি।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর প্রতিটি তলায় পিরিয়ডকালে ব্যবহার উপযোগী টয়লেট তৈরি করা এখনও সম্ভব হয়নি। মাত্র ১৪৭জন আইনজীবী নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি যাত্রা শুরু করেছিল। সেখানে এখন নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৯ হাজার আইনজীবী পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তাই প্রতিটি ভবনে স্থানসঙ্কুলানও হয় না। এসব মিলিয়ে নারীদের মাসিকবান্ধব টয়লেট ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। তবে, সুপ্রিম কোর্টের পাশেই ১৬ তলা একটি ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। সেই ভবন নির্মাণ হলে সব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।’

সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ অফিসার ব্যারিস্টার মো. সাইফুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রায় দুই মাস আগে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের নির্দেশে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার গোলাম রব্বানী বিষয়টি সার্বিক তদারকি করছেন। আমরা সুপ্রিম কোর্টের সব টয়লেট সংস্কার ও ভালোভাবে পরিষ্কার করিয়েছি। সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট রয়েছে। কিন্তু, অনেকেই ভুলক্রমে নারীদের টয়লেটে চলে যাচ্ছেন, এটি একটি সমস্যা। তবুও, আমাদের পরিচ্ছন্নকর্মীরা টয়লেট পরিষ্কারের বিষয়ে সবসময় সচেতন থাকেন। কিন্তু, সুপ্রিম কোর্টের ভবনগুলোতে মাসিকবান্ধব টয়লেট ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। এ বিষয়ে কেউ যদি আমাদের কাছে আপত্তি জানায়, তবে অবশ্যই বিষয়টি প্রশাসন (সুপ্রিম কোর্ট) থেকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।’

ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, ‘খুব ছোট করেও যদি উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে এ অবস্থা থেকে উন্নতি সম্ভব। এটি কোনও বড় চাওয়া নয়। নারীদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক টয়লেট বাড়ানো, টয়লেটের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং টয়লেটের প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো (পানি, টিস্যু পেপার, সাবান, বিন) নিশ্চিত করা দরকার।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.