সময় এসেছে জড়তা ভেঙে সচেতন হওয়ার

This content was developed for Bangladeshi Nationals.

দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। স্কুল থেকে বনভোজনে যাওয়া হবে। সকাল থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে সাবরিনা (ছদ্মনাম), যদিও শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছে। ক্লাসের প্রথম ও বিভিন্ন কো-কারিকুলাম কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় সাবরিনার ওপর স্বাভাবিকভাবে একটু বেশিই দায়িত্ব এসেছে। যাত্রা শুরুর আগে সবাইকে ডেকে বিভিন্ন জনকে কিছু কিছু করে দায়িত্ব বণ্টন করে দিয়েছে সে। এরপর শুরু হলো যাত্রা।

কিন্তু বাসে উঠে কিছুদূর যাবার পর, হঠাত্ করে সাবরিনা খেয়াল করলো ওর মাসিক হয়েছে। কোনো রকম ব্যবস্থা না নিয়েই বের হওয়ায়, বাসের মধ্যে কি করা উচিত বুঝতে পারলো না। কাউকে কিছু না বলে, একেবারে পিছনের সিটে গিয়ে চুপচাপ বসে পরলো। সবাই হৈ-চৈ করলেও কিছুই ভালো লাগছিল না ওর। কিছুক্ষণ পর বন্ধুরা গান গাওয়ার জন্য ওকে ডাকলো, কিন্তু সাবরিনা সিট থেকে একটুও নড়লো না। বরং বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেললো। এমন ঘটনা কেবল সাবরিনার ক্ষেত্রে কিংবা বাসে যাত্রাকালীনই ঘটে না। বরং স্কুলে দীর্ঘ সময় থাকা অবস্থায়ও যেকোনো সময় কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা হতে পারে।

এরকম পরিস্থিতিতে অপ্রস্তুত না হয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সচেতনতার ও সঠিক জ্ঞানের অভাবে প্রতি বছর সারা দেশে অনেক কিশোরী সঠিকভাবে লেখাপড়ায় অংশ নিতে পারছে না। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সায়েন্টিফিক এন্ড টেকনোলজি রিসার্চ, ২০১৩-এর মতে, মাসিক চলাকালে ৩৯% শিক্ষার্থী কমপক্ষে একদিনের জন্য হলেও স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। শুধু অনুপস্থিত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পুরো সময়টিতে তারা ক্লাসে সঠিকভাবে মনোযোগ রাখতে পারে না। শুধু তাই নয়, ৭২% কিশোরী সর্বশেষ মাসিকে অস্বাভাবিক শারীরিক অবস্থায় পড়েছিলেন। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়াটার এইডের সহায়তায় আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ২০১৩ সালে দেশের সব জেলা থেকে মোট আড়াই হাজার পরিবারের দুই হাজার ১০৭ জন বয়স্ক নারী ও ৩৭৭ জন কিশোরীর তথ্য নেয়। এ ছাড়া ৭০০ স্কুলের ২ হাজার ৩৩২ জন ছাত্রীর মতামত নেওয়া হয়। অন্য একটি, জরিপে দেখা গেছে, ছাত্রীদের ৬৮ শতাংশ বলেছে, প্রথমবার মাসিক হওয়ার আগে তারা এ বিষয়ে জানত না। ছাত্রীদের ৮২ শতাংশ মাসিকের সময় পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। মাত্র ১ শতাংশ স্কুলে ব্যবহার করা প্যাড ফেলার ব্যবস্থা আছে। জরিপে ৪০ শতাংশ ছাত্রী বলেছে, মাসিকের কারণে গড়ে মাসে তারা তিনদিন স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। অন্যদিকে ৩৮ শতাংশ কিশোরীকে এবং ৪৮ শতাংশ বয়স্ক নারীকে মাসিকের সময় ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় না। সমাজে এখনো মাসিকের বিষয়টি লুকিয়ে রাখার বিষয় হয়ে আছে।

সিমাভি, টিএনও, বিএনপিএস, ডর্প এবং নেদারল্যান্ড সরকারের সহায়তায় ঋতু প্রকল্পের মাধ্যমে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে রড অরেঞ্জ মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন্স। কিশোরীদের মাসিক সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো সমস্যা বা জটিলতা এড়াতে কী করণীয় হতে পারে? এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম রেড অরেঞ্জ মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন্স-এর হেড অব প্রোগ্রামস নকীব রাজীব আহমেদ। তিনি বলেন, মেয়েদের মাসিক সংক্রান্ত সঠিক তথ্য ও নির্দেশনা সঠিক সময়ে দিতে হবে। যাতে তারা যেকোনো সমস্যা সেই তথ্য ও নির্দেশনা মোতাবেক সমাধান করতে পারে। এছাড়াও, মাসিক সময়ে ও মাসিক সংক্রান্ত পর্যাপ্ত সহায়তা স্কুল থেকে শিক্ষকদের সরবরাহ করা এবং মাসিকবান্ধব টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন সার্ভে ২০১৪ অনুযায়ী, গড়ে ১২ বছর বয়সে মেয়েদের প্রথম মাসিক হয়। তাদের মধ্যে মাসিক শুরুর আগে মাত্র ৩৬% মাসিক সম্পর্কে জানে। তাদের মধ্যে ৪৫% শিক্ষার্থী সাধারণত মাসিক সম্পর্কে জানে। সেক্ষেত্রে নারী আত্মীয়রাই সবচেয়ে বড় উত্স জানার ক্ষেত্রে। মাত্র ১০ শতাংশ ডিসপোজাল প্যাড ব্যবহার করে। যেখানে, ৮৬% ব্যবহার করে পুরাতন কাপড়। এদের এক চতুর্থাংশ মাসিক চলাকালে স্কুলে যায় না এবং এক তৃতীয়াংশ মনে করে মাসিক স্কুল ও লেখাপড়ার ক্ষেত্রে সমস্যা করে।

মাসিক সময়ে কিংবা অনিয়মিত মাসিক হওয়ার আশঙ্কা থাকলে, বাড়ি থেকে বের হবার আগে কিংবা সবসময়ই ব্যাগে মাসিকের সময় ব্যবহার করা হয় এরকম প্রয়োজনীয় জিনিসসহ পরিষ্কার কাপড়, তুলা বা প্যাড, হিটিং প্যাডস, আরামদায়ক কাপড়, প্ল্যাস্টিক ব্যাগ, টিস্যু, হ্যান্ড সেনিটিজার ইত্যাদি সাথে রাখতে হবে। তার চেয়েও যেটি প্রয়োজন সেটি হচ্ছে সব জড়তা ভেঙে সচেতন হওয়ার।

Source: http://archive1.ittefaq.com.bd/print-edition/mohla-aongon/2018/04/23/272431.html

Leave a Reply

Your email address will not be published.