সংকোচের দেয়াল ভাঙতে হবে

This content was developed for Bangladeshi Nationals.

সাবিনা ইয়াসমিন। বয়ঃসন্ধিকালের প্রথম শারীরিক পরিবর্তনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে কিছুটা লজ্জাতেই পড়লেন। মফস্বলের অন্যসব মেয়ের মতো পিরিয়ড নিয়ে তারও খুব একটা স্বচ্ছ ধারণা ছিলো না কিন্তু সংকোচ আর শঙ্কা ছিলো প্রবল। তাই এই বিষয়ে যতটুকু পেরেছেন গোপন রেখেছিলেন। শুধু সাবিনাই নয়। স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার এই বিষয়টি সাবিনার মতো প্রায় সবাই লুকিয়ে রাখে। সহজে কাউকে বলতে চান না। আর প্যাড কিংবা কাপড় কড়া রৌদ্রে শুকানো এবং ভালোভাবে গুছিয়ে রাখাটাও যেন এক চরম লজ্জার বিষয়। কিন্তু বাস্তবতায়, এ সম্পর্কে সঠিক তথ্যগুলো নিজে জানা যেমন জরুরি তেমনি আশপাশের মানুষদের জানানোও প্রয়োজন। তবেই গোপনীয়তা ও লজ্জা দূর করে এলাকায়, শিক্ষাঙ্গনে, বন্ধুমহলে, আত্মীয়স্বজনের মাঝে মাসিকবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। রাজধানীর বহুতল ভবনে যেসব নারী স্যানিটেশন প্যাড ব্যবহার করেন তাদের মধ্যেও কিছু নারী প্যাডটি ময়লার গাড়িতে না দিয়ে পেছনের জানালা দিয়ে ফেলে দেন।

এসব প্যাড পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুঁমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাসিককালে প্যাড ব্যবহার ও জনসচেতনা বাড়াতে পরিবারের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বাড়িধারা ও ধানমন্ডির প্রায় ৫০টি বহুতল বাড়ি পরিদর্শনকালে দেখা যায়, বাড়িগুলোর সামনের অংশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলেও পেছনের দৃশ্য ভিন্ন। লোক-লজ্জায় ব্যবহৃত প্যাড কাগজে না মুড়ে পেছনের জানালা দিয়ে ফেলে দেওয়ায় বাড়ির পেছনে ময়লার স্তূপে পরিণত হয়েছে। বাড়িধারা জে- ব্লকের ১৬ নম্বর বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব কর্নার ফ্ল্যাটের ১০ তলা থেকে একজন নারী তার ব্যবহৃত প্যাডটি জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছেন। সেটি মাটিতে না পড়ে ৯ তলা ফ্ল্যাটের জানালার ওপরে ঝুলছে। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়, বনানী এলাকার বি-ব্লকের ২০১ নম্বর বাড়িটির। বাড়িটি ৮ তলা হলেও পেছনের জানালায় প্যাড ঝুলে থাকতে দেখা যায়নি। এ বাড়িটির নিরাপত্তারক্ষী আব্দুল মালেককে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, গত দেড় বছর আগেও বাড়ির পেছনের জানালায় স্যানিটেশন প্যাড ঝুলতে দেখা গেছে।

এ নিয়ে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যে বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। এজন্য এখন ফ্ল্যাট খালি হলে নতুন ভাড়াটিয়া ওঠার আগেই তাদের ময়লা-আবর্জনা, প্যাড, প্ল্যাস্টিকের বোতল যেন জানালা দিয়ে না ফেলা হয়, সেটি আগেই বলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ অভিজাত এলাকার ৫০টি বাড়ির মধ্যে মাত্র ১টি বাড়িতে সচেতনামূলক এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।অন্যদিকে ঢাকায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ লেখাপড়া করেন ইডেন মহিলা কলেজ ও হোম ইকোনমিকস কলেজে। দুটি কলেজে আবাসিক ব্যবস্থাও রয়েছে। এসব শিক্ষার্থীরা মাসিককালে তাদের ব্যবহৃত প্যাড কোথায় ফেলে দিচ্ছেন? এ বিষয়ে কলেজের দুজন শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার ও আকলিমা আক্তার নেহা বলেন, ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ২টি টয়লেট। অন্য সময়ে দুটি টয়লেট ব্যবহারে সমস্যা না হলেও মাসিকের সময়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। একজন টয়লেটে গেলে আরেকজন অপেক্ষায় থাকে। এ নিয়ে সব সময় মাথায় টেনশন কাজ করে। তারা ব্যবহৃত প্যাড কাগজে মুড়ে ময়লার ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে। এর মধ্যেও অনেকে ডাস্টবিনে না ফেলে টয়লেটের পেছনের জানালা দিয়ে ফেলে দিচ্ছেন।

মাসিককালে ব্যবহৃত প্যাডের ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্যানিটেশন প্যাড ব্যবহার ও যথাযথ স্থানে ফেলে দেওয়ার বিষয়গুলো একজন শিক্ষক ক্লাসে সহজেই বলতে পারেন। কারণ একজন শিক্ষক যা বলবেন শিক্ষার্থীরা সহজে সেটি মেনে চলবেন। এজন্য শিক্ষকদের আগে নিজে ভালো হতে হবে, তা-না হলে তার (শিক্ষক) উপদেশ বা ভালো কথা কেউ শুনবে না। ভালো কথা বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে প্রচার করার আগে ক্লাসে নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। মাসিকের বিষয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা থাকলেও শিক্ষকরা তা ভালোভাবে পড়ান না। এজন্যই শিক্ষকসহ সমাজের সকল শ্রেণির লোকজনদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে সিমাভি, নেদারল্যান্ড সরকার, ডর্প, বিএনপিএস এবং রেড অরেঞ্জ মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন্স। প্যাড কাগজে মুড়ে কেন ফেলে দেওয়া হচ্ছে না?

জানতে চেয়েছিলাম মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে আসা রেড অরেঞ্জ মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স-এর হেড অব প্রোগ্রামস নকীব রাজীব আহমেদ-এর কাছে। তিনি বলেন, লোকলজ্জা ও সমাজে সচেতনতার অভাবে নারীরা মাসিকের ব্যবহৃত সাদা-কাপড় ও প্যাড আগুনে না পুড়িয়ে, জানালা দিয়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। সমাজের ভেতর কুসংস্কার রয়েছে মাসিকের কাপড় পুরুষ মানুষ দেখে ফেললে তার আয়ু কমে যাবে। মাসিকের সময়ে দুধ, ডিম, বাদাম, মাছ ও মাংস খাওয়া যাবে না, ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। এসব ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে পরিবার, প্রাইমারি, হাইস্কুলে আলোচনা বাড়াতে হবে। মাসিকের সময়ে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। মাসিক একটি মেয়ের শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা সাধারণত ১০-১৩ বছর বয়সে শুরু হয় এবং স্বাভাবিক নিয়মে ৪৫-৪৯ বছর বয়স পর্যন্ত চলে। তবে কারও ৯ বছর বয়স থেকেও মাসিক স্রাব শুরু হতে পারে। মাসিক স্রাব শুরু হওয়ার প্রথম বছরগুলোতে কিছুটা অনিয়ম হতে পারে এবং তলপেটে ব্যথা হতে পারে।

এ ব্যাপারে ডা. এলভিনা মুসতারী বলেন, সঠিক সময়ে পরিচর্যা না নিলে ইনফেকশন হয়ে কিডনির সমস্যা হতে পারে। এমনকি নারীর মা হওয়ার যে ধারণক্ষমতা তা হারিয়ে যাবে। জরায়ুতে ক্যান্সার হতে পারে। এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। সচেতন হওয়া। বাজারে যে প্যাড পাওয়া যায় তা অনটাইম ব্যবহার করা। প্রায় ৬ ঘণ্টা পড়তে পারবে। তবে মাসিকের সময়ে রক্তপাত বেশি হলে প্যাডটি বারবার পরিবর্তন করতে হবে। উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য অপসারণে নিয়োজিত কর্মী মো. মুসা বলেন, প্রতিদিন ধানমন্ডি এলাকায় ৫-৬ গাড়ি ময়লা-আবর্জনা ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নিয়ে যাই। অধিকাংশ কাঁচাবাজারের উচ্ছিষ্ট, প্ল্যাস্টিকের বোতল। সেখানে কাগজে মুড়ানো প্যাড দেখা যায় না।

প্রসঙ্গত, স্যানিটারি ন্যাপকিন/প্যাড, কাপড় ব্যবহার ও সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য প্যাড বা কাপড় পরিবর্তনের আগে ও পরে ভালোমত হাত পরিষ্কার করতে হবে। প্রতি তিন বা চার ঘণ্টা পর প্যাড পরিবর্তন করতে হবে। প্যাডটি অথবা কাপড়টি ভালো করে মুড়ে আবর্জনার মধ্যে ফেলতে হবে। টয়লেটের মধ্যে ফেললে সুয়ারেজ লাইন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে একজনের কারণে পুরো বাড়ির লোকজনের ভোগান্তি হতে পারে।

Source: http://www.amar-sangbad.com/lifestyle/articles/76841

Leave a Reply

Your email address will not be published.