মাসিককালীন খাদ্য গ্রহণ, তৈরি করছে অপুষ্টির দুষ্ট চক্র

This content was developed for Bangladeshi Nationals.

মাসিক বা পিরিয়ড মেয়েদের খুব স্বাভাবিক একটি শরীরবৃত্তীয় প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের দেশে কুসংস্কারাছন্ন সমাজ এই স্বাভাবিক বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে, তা পৌঁছে গেছে লজ্জার মোড়কে মোড়া এক গোপনীয় বিষয় হিসেবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ট্যাবু। তাই বিষয়টি নিয়ে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা দূরে থাকে, কোনো মেয়েও তার মায়ের সঙ্গে আলাপ করতে লজ্জাবোধ করেন, অনেক কিছুই গোপন করেন।

মাসিকের আলোচনা লজ্জার- শুধু এ ভাবনা থেকেই লাখ লাখ মেয়ে মাসিককালীন সমস্যাগুলো গোপন করেন, বাঁধিয়ে বসেন নানা রকম দূরারোগ্য রোগ। বিষয়টি এতই স্পর্শকাতর যে, শুধু মাসিককালীন সময়ে একজন নারী কী খাচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করে ওই নারীর সারা জীবনের সুস্বাস্থ্য, তার পরবর্তী প্রজন্মের সুস্থতা-মেধার বিকাশ।

মাসিকের সঙ্গে খাদ্যের সম্পর্ক

মাসিককালে মেয়েরা যে রক্ত হারায় তার সঙ্গে প্রচুর পুষ্টি উপাদানও শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। এসব পুষ্টি উপাদানের ক্ষয়পূরণ করতে মাসিক চলাকালে প্রচুর ভিটামিন ও মিনারেলস জাতীয় বিশেষ করে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া প্রয়োজন।

মাসিকের সময় শরীর থেকে যে পরিমাণ আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান বেরিয়ে যায়, খাবার গ্রহণের মাধ্যমে সেই পরিমাণ পুষ্টি উপাদান শরীরে প্রবেশ না করলে এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আর আয়রনের ঘাটতির কারণে অ্যানিমিয়া হয়ে থাকে। যা রক্তে স্বাস্থ্যকর ব্ল্যাড সেল তৈরিতে বাধা দেয়।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৪২ ভাগ নারীর রক্তে আয়রনের ঘাটতি আছে, যা অ্যানিমিয়ার লক্ষণ। অর্থাৎ প্রতি ১০ জন মেয়ের মধ্যে ৪ জন অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতার শিকার।

মাসিকের সময় মাছ-মাংস-দুধ ইত্যাদি খেলে রক্তে বাজে গন্ধ হয়, বেশি রক্তক্ষরণ হয় ইত্যাদি ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত রয়েছে, তাই মেয়েরা এ সময় মাছ-মাংস খেতে চায় না, অন্যদিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভুল ধারনাগুলোকে সত্য মনে করে মায়েরাও তাদেরকে এসব পুষ্টিকর খাবার খেতে নিরুৎসাহিত করে। এভাবে পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ থেকে বিরত থাকার ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটি অপুষ্টির শিকার হয়।

মাসিক ও অপুষ্টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যা বলেন

মাসিকের সঙ্গে পুষ্টির বিষয়টি একটু জটিল ও বাড়াবাড়ি রকমের মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যেটিকে আমরা কোনোদিন গুরুত্বই দেইনি। এটা অনেকটা দারিদ্রের দুষ্ট চক্রের মতো। একজন দরিদ্র ব্যক্তির সন্তান নিজেকে দারিদ্রের জাল থেকে মুক্ত করতে পারে না। যে দারিদ্রের ফাঁদে আটকা পড়ে অন্তত তিনটি প্রজন্ম। ঠিক তেমনই অপুষ্টিতে ভোগা একজন নারীর জন্ম দেওয়া সন্তানও যে অপুষ্টির শিকার হয়ে অপরিপক্ক আর মেধাহীন হবে সেটা খুব স্বাভাবিক। আর অপুষ্টির শিকার সেই সন্তান বড় হয়ে নিজে যখন বাবা বা মা হতে তার সন্তান কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়।

তা ছাড়া এই সন্তান সারা জীবনই কম বেশি অসুখ-বিসুখে ভুগতে থাকবে। সেক্ষেত্রে ওই পরিবারটিকে দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হবে। যা বার বারই ঘুরে-ফিরে আসে।

তাই মেয়েদের মাসিককালীন সময়ে খাদ্য গ্রহণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও পুষ্টি বিশারদরা।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনইস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহসেনা আক্তার প্রিয়.কমকে বলেন, ‘মাসিক চলাকালে মেয়েদের শরীর থেকে প্রচুর ভিটামিন ও মিনারেলস বেরিয়ে যায়। এ জন্য ওই সময়ে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ খুবই জরুরি। অন্যথায় মাসের পর মাস এভাবে চলতে থাকলে মেয়েটি ধীরে ধীরে অপুষ্টির শিকার হয়। শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো হারিয়ে পরবর্তী সময়ে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’

মাসিককালীন সময়ে মেয়েদের সঠিক খাদ্যগ্রহণ পরবর্তী প্রজন্মের সুস্থতার চাবিকাঠি বলে মন্তব্য করে মোহসেনা আক্তার আরও বলেন, ‘অপুষ্টির শিকার একটি মেয়ে কীভাবে সুস্থ বাচ্চার জন্ম দেবে? খুব স্বাভাবিক, বাচ্চাটি জন্মগতভাবে অপুষ্টির শিকার হবে। এর প্রভাব গিয়ে পড়বে ওই বাচ্চার সন্তানদের ওপর। এর অর্থ দাড়াচ্ছে, মাসিক চলাকালে খাদ্যে অবহেলায় কয়েক প্রজন্মকে ভোগাতে পারে।’

মাসিককালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় খাদ্যের ভূমিকা কতটা, এ প্রশ্নের জবাবে ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার সোমা আক্তার বলেন, ‘মাসিক চলাকালে বিশেষ করে শেষ দিকে শরীরে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ঘাঠতি দেখা দেয়। ফলে খাদ্যের চাহিদা বাড়ে। এ সময় পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণের অভাবে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। খাদ্যে অবহেলা যদি ধারাবাহিক হয় তবে, এটি পরবর্তী সময়ে মেয়েটির জীবন ও তার পরিবারে চরম দুর্ভোগ নিয়ে আসতে পারে।’

দেশে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে করে বেসরকারি সংগঠন ওয়াশ অ্যালায়েন্স ইন্টারন্যাশনাল।
এই সংগঠনটির কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর অলক কুমার মজুমদার প্রিয়.কমকে বলেন, ‘মাসিককালীন সময়ে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে অবহেলা বা অসচেতনতা মারাক্তক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এ সময় শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া পুষ্টির অভাব যথাযথভাবে পূরণ না হলে যে কোনো নারীই অপুষ্টির শিকার হতে পারেন। এবং এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ওই নারী অপুষ্ট বা খর্বকায় সন্তানের জন্ম দিতে পারেন।’

মাসিককালীন পুষ্টি সচেতনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে অলক কুমার আরও বলেন, ‘সুস্থ জাতি গঠনে সব ধরনের কুসংস্কার ও ভুল ধারনাকে অতিক্রম করার বিকল্প নেই। তাই জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিমালায় মাসিককালীন পুষ্টি পরিচর্যার বিশেষ গুরত্ব দেওয়া ছাড়াও পাঠ্যপুস্তক ও স্কুলে গুরুত্বসহকারে দিয়ে পাঠদান বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।’

মাসিকের সময় যেসব খাদ্যগ্রহণ জরুরি

যথাযথভাবে শারীরিক বৃদ্ধি, আত্মোন্নয়ন এবং কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সঠিক খাদ্যাভাসের বিকল্প নেই। মাসিকের সময় সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা খুবই জরুরি। মাসিকের সময় যে সব খাদ্য তালিকায় থাকা প্রয়োজন সেগুলো হলো-

শর্করার মধ্যে শাকসবজি, দই, আলু; আমিষ জাতীয় খাদ্যর মধ্যে ডিম, ডাল, বাদাম, মাছ ও মাংস; আয়রন বা লৌহ জাতীয় খাদ্যের মধ্যে ডিম, সিম, পালংশাক, কলা, আপেল, গুড়, খেজুর, কালোজাম ইত্যাদি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্যের মধ্যে বাদাম, সয়াবিন, গাঢ় সবুজ শাক-সবজি; ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ দুগ্ধজাত খাবার যেমন দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এবং পরিমিত লবণযুক্ত খাবার খেতে হবে। তবে এসব খাবারের সঙ্গে তাজা ফলের রস এবং প্রতিদিন অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি খাওয়াও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

Source : https://www.priyo.com/articles/menstrual-food-is-taking-the-evil-cycle-of-malnutrition-is-created-201806291531/

Leave a Reply

Your email address will not be published.