প্রথম মাসিক: আগেই সচেতন করুন কিশোরীকে

This content was developed for Bangladeshi Nationals.

দেশের ৩৬ ভাগ মেয়েরই ধারণা নেই প্রথম মাসিক সম্পর্কে। উদ্বেগজনক এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে গবেষণায়। অথচ মাসিক একটি প্রাকৃতিক বিষয় এবং এই না জানার কারণ, ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ ক্ষতি। কন্যা সন্তানের সুস্বাস্থ্যের ব্যাপারে মূল দায়িত্ব বাবা-মা’র হলেও সামাজিক কারণে অনেকেই এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন না। যার ফলে, প্রথম মাসিকে একধরনের ভীতি তৈরি হয় কিশোরী মনে, ঘাটতি দেখা দেয় আত্মবিশ্বাসে।

সমাজে এখনও মাসিক নিয়ে কানকানি রয়ে গেছে। হঠাৎ প্রথম মাসিক হলে অনেকই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। শহরের চিত্রে সামন্য পরিবর্তন এলেও বদলায়নি গ্রাম। এখনও মাসিক নিয়ে আছে নানা কুসংস্কার। অনেকে এ সময়ে মেয়েকে খাবার গ্রহণে বাধা দেয়। অথচ শরীর থেকে রক্ত ক্ষরণের ফলে তার তখন দরকার পুষ্টিকর খাবার। এর ফলে মেয়েটির শারীরে জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। কমতে থাকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাসিক বিষয়টি গোপনীয় হিসেবে প্রচলিত থাকায় অনেক সময় এ জাতীয় রোগের ঠিকমত চিকিৎসাই হয় না।

প্রথম মাসিক একজন কিশোরীর জন্য ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। এসময় তার মাঝে ভীতির পাশাপাশি অপরাধবোধ ও সংকোচ দেখা যায়। একজন কিশোরী স্কুলের শ্রেণিকক্ষে এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখে পড়লে সামাল দিতে পারে না, সেটাই স্বাভাবিক। এমনকি বাসায় হলেও খোলামেলা সম্পর্ক না থাকলে তা সামাল দেয়া ভীষণ কঠিন। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নেই মাসিক-বান্ধব টয়লেট। যেখানে থাকার কথা, ঢাকনাসহ বাক্স, প্যাড বা মাসিকেব্যবহৃত পরিস্কার শুকনো কাপড়। এমনকি শিক্ষার্থীকে নির্দেশনা দেয়ার মতো, শিক্ষকও নেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে। গ্রামের কথা বাদ দিলেও শহরেও এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেখা মেলা ভার। সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠগুলোতেও দেখা যায় না মাসিক-বান্ধব টয়লেট। ২০১৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুলের টয়লেট নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও মাসিক-বান্ধব রাখতে একটি পরিপত্র জারি করেছিল। কিন্তু সে বিষয়ে বাস্তবে তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা বিষয়টি জানেই না।

স্কুলে মাসিক ব্যবস্থাপনার ভাল পরিবেশ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে, এমনকি কেউ কেউ পরীক্ষায়ও অংশ নেয় না। এতে ঝড়ে পড়ার হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনুপস্থিতি থাকলে বঞ্চিত হতে পারে উপবৃত্তি থেকে। শুধু সচেতনতার অভাবে একটা স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক বিষয় হয়ে উঠছে, ভীতি-আতঙ্কের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ছয় ঘণ্টা পর পর ন্যাপকিন বা কাপড় বদালানো দরকার। কিন্তু অনেক মেয়ে মাসিক বান্ধব টয়লেটের অভাবে সারা দিনেও প্যাড বা কাপড় বদলাতে পারে না, অপেক্ষায় থাকে কখন বাড়িতে ফিরবে। চিকিৎসকরা জানান, দিনের পর দিন এভাবে চলতে থাকলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। প্যাডের দাম বেশি হওয়ায় দেশের চার কোটিরও বেশি কিশোরী ও নারী মাসিকের সময় পুরনো কাপড় ব্যবহার করেন। তবে কাপড় ব্যবহার করলেও এটি সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনায় তাদের তেমন ধারণা নেই। মাসিকের কাপড় ভালভাবে পরিস্কারের পর কড়া রোদে শুকাতে হয়। বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে উল্টোটি। যার ফলে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও অনেক বেশি। এতে মূত্রনালি ও জরায়ুতে সংক্রমণ হতে পারে। তাছাড়া পুরনো, অপরিস্কার কাপড় ব্যবহারের ফলে অতিরিক্ত রক্তপাতের আশঙ্কা থাকে। অপরিস্কার ন্যাকড়া ব্যবহারের কারণে নারীর পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (পিআইডি) এবং ফ্যালোপিয়ান টিউবে ব্লক হচ্ছে। এসব রোগের কারণে বাড়ছে বন্ধ্যাত্বের হার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে বাবা-মা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে। মাসিক শুরুর আগেই স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে এ বিষয়ে। মেয়ের সাথে খোলামেলা আলাপের মাধ্যমেই বিষয়টিকে নিয়ে যেতে হবে স্বাভাবিক পর্যায়ে, যাতে মাসিকের সময় সে নির্দ্বিধায় বলতে পারে সব। আজকের কিশোরীই আগামীর মা; মায়েরা রুগ্ন হলে কখনই সমৃদ্ধ হবে না দেশ।

Source: https://www.jamuna.tv/news/57160

Leave a Reply

Your email address will not be published.