ছাত্রীদের সুস্বাস্থ্যের জন্যে মানসম্মত স্যানিটারি ও পর্যাপ্ত পানি

This content was developed for Bangladeshi Nationals.

৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০১৬-২০ ছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট এবং পর্যাপ্ত স্যানিটারি ন্যাপকিন ও পরিষ্কারের সুবিধা অন্তর্ভূক্তিকরণের গুরুত্ব আরোপ করা হয়। উপরন্তু ২০১৫ সালে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট ব্যবস্থাপনা, যার মধ্যে উন্নত সুবিধাসহ সাবান, পানির ব্যবস্থা, বিন এবং মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর মেয়েদের শিক্ষা দেয়ার জন্য নারী শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার জন্য সকল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

২০১৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন সার্ভে অনুযায়ী প্রতি ১৮৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১টি টয়লেটের ব্যবস্থা। যার ফলে সেক্টর উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসডিপি) ২০১১-২০২৫ অনুযায়ী ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি টয়লেট সুপারিশ করেছে। গ্রামীণ এলাকায় (৪৩%) অর্ধেকের কম স্কুলে উন্নত এবং কার্যকরী টয়লেট ছিল যা মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা ছিল। মাত্র ২৪% স্কুল টয়লেট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পাওয়া গিয়েছিল, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩২%) স্কুলে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল। শহর এলাকায়, ৬৩% স্কুলে উন্নত এবং কার্যকরী টয়লেট যা মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা ছিল, ৪৭% স্কুলে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল।
কিন্তু মেয়েদের স্কুলে সঠিক মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বান্ধব টয়লেট এবং পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) সুবিধা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেটের পরিমাণ সরকারি পরিপত্র বা বিজ্ঞপ্তিতে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। যার ফলে স্কুলের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ফাইন্যান্সিং স্ট্র্যাটেজি ২০১৭ প্রণীত দলিলটিতে স্কুলের মধ্যে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন সুযোগ সুবিধার জন্য বিনিয়োগ সম্পর্কে কোনও পরিষ্কার নির্দেশনা না থাকায় মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে বিদ্যালয়ে বিনিয়োগ অনুপস্থিত।

৭ম শ্রেণীর নাবিলার স্কুল চলাকালীন সময় পিরিয়ড হয়, বান্ধবীকে বলে দুজন স্কুলের অফিসরুমে আসে। অফিস সহকারী হিসাবে যে দুজন দিদি আছে তাদের কাছে প্যাড চায়। কিন্তু প্যাড নেই জানিয়ে দেয়। (স্কুলের এই দিদিদের কাছে প্যাড থাকে, শিক্ষার্থীরা প্রয়োজন হলে দিদিদের কাছ থেকে নিতে পারে। অবশ্য সাথে সাথে প্রতি প্যাড দশ টাকা করে নিতে হয়। কিন্তু সেদিন প্যাড শেষ হয়ে যায়) নাবিলা অফিসের ফোন থেকে বাসায় মাকে কল করে, মায়ের মোবাইল বন্ধ পেলে বাবাকে কল করে। বাবা তখন অফিসে, বাবাকে বলে – যেভাবে হোক মাকে স্কুলে কল করতে বল”। বাবা খবর পৌঁছায় মায়ের কাছে, নাবিলার মা কল করে স্কুলে। ততক্ষণ নাবিলা স্কুলের অফিস রুমের পাশে সেবা কক্ষে অপেক্ষা করে। নাবিলার মাকে বিষয়টা বললে, তিনি মেয়ের জন্যে প্যাড আর জাঙ্গিয়া নিয়ে আসেন। ঘটনাটি ২০১৮ সালের। ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ঘোষণা দেয়া ২০১৬-২০ ছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট এবং পর্যাপ্ত স্যানিটারি ন্যাপকিন ও পরিষ্কারের সুবিধা থাকলে নাবিলাকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।

২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৬ ভাগ নারী মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার না করে পুরনো কাপড় বা ন্যাকড়া ব্যবহার করেন। এতে কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন ডা: মাহমুদা আক্তার। স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং ওয়াটার এইড সংস্থার সহায়তায় আইসিডিডিআরবি জরিপটি পরিচালনা করে।

ডা. মাহমুদা আক্তার বলেন, “পিরিয়ডের সময় অপরিষ্কার পুরনো কাপড় ব্যবহার করলে জ্বর, তলপেটে ব্যথা ও মূত্রনালীতে সংক্রমণ হতে পারে। এছাড়া জরায়ুতে ইনফেকশন হতে পারে। ইনফেকশন দীর্ঘদিন থাকলে পরবর্তিতে সেটি জরায়ুর ক্যানসারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পুরনো, অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহারে পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্তপাতের সম্ভাবনাও থাকে।”
২০১৮ সালে ডর্প কর্তৃক এ বিষয়ে প্রণীত পলিসি ব্রিফে বেশ কিছু প্রস্তাবনা বা সুপারিশ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তুলে ধরা হয়েছে। কয়েকটি হচ্ছে- সেক্টর উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসডিপি) ২০১১-২৫ এর নির্দেশনা অনুসারে, ১:১৮৭ এর পরিবর্তে ১:৫০ জন ছাত্রীর জন্য নতুন এবং পৃথক টয়লেট তৈরি ও পরিচালনার জন্য বাজেট বরাদ্দে অবশ্যই স্কুলকে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। প্রতিটি স্কুলে সাবান ও পানির পাশাপাশি হাত ধোয়ার স্থান রাখতে হবে, যাতে মেয়ে শিক্ষার্থীরা সেগুলি ব্যবহার করতে পারে। এসব ব্যবস্থাপনার বাস্তবায়ন রাখতে হলে নিয়মিত এগুলোকে কার্যকরী এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা। চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচী (পিইডিপি-৪) এর সাথে সাথে প্রাথমিক স্তরের পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) সুবিধাগুলি নিশ্চিতের জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং প্রাপ্যতার জন্য স্কুল লার্নিং ইমপ্রোভমেন্ট প্ল্যান (এসএলআইপি) এ বাজেট বৃদ্ধি করা। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখা। এটি ছাত্রীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন/চর্চা করতে সহায়তা করা। জাতীয় মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা কৌশলপত্র নির্দিষ্ট প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ডরপ এর গবেষণা ও অনুশীলনে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার এবং অন্যান্য সেক্টরের সাথে লবিং এবং এডভোকেসির ফলে নেত্রকোনা জেলার ৮৯টি বিদ্যালয়ে টয়লেট রিয়েলাইজেশন করার জন্য ঋতু প্রকল্প থেকে সর্বমোট খরচের মধ্যে ৬২৬০৮৯ টাকা (২০%) এবং বাকি ৮০% এর মধ্যে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি (২২%), ইউনিয়ন পরিষদ (২২%), উপজেলা পরিষদ (৮%), সেকেন্ডারি এডুকেশন এ্যাকসেস এনহেন্স প্রজেক্ট (সেকায়েপ) থেকে (২৮%) বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

ঘরের পেছন পাশে পরিবারের মেয়েদের ব্যবহারের জন্যে একটা প্র¯্রাবাগার ছিলো। চারপাশে সুপারি পাতার বেড়া খুব বেশি হলে পুরানো পলাস্টারের কাপড়ে ঘেরা। এর ভেতরে মা ছোট কাপড় নেড়ে দেয়ার জন্যে দড়ি টানা দিয়ে বেঁধে রাখতেন। আমরা পরিবারের মেয়ে আর মহিলারা প্রতিমাসে পিরিয়ডের কাপড় পরিস্কার করে এখানেই নেড়ে দিতাম। ঢাকায় আসি বড় বোনের কাছে, বোন তখন দুই বান্ধবী নিয়ে একরুমে ভাড়া থাকতো। বাবা বাজার থেকে এসে একটা ছোট প্যাকেট হাতে দেন, আর বলেন- “এটা তোর।” দুরে গিয়ে খুলে দেখি একটা জাঙ্গিয়া, লজ্জায় আমি যেন আর নেই।—(১৯৮৯/৯১ সালের কথা)।

প্রত্যেক মাসের একটি সময়ে মেয়েদের পিরিয়ড বা মাসিক হয়ে থাকে। মেয়ে জ্বিন প্রাপ্ত সকল নারী এটার মুখোমুখি হয়। ২০১৭/১৮ সালের উদাহরণ যতই বলি না কেনো পিরিয়ড একজন নারীর জন্যে যতই স্বাভাবিক ঘটনা হউক না কেন আদতে নারী পুরুষ কেউই এটাকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেনা। প্রায় সবাই পিরিয়ড, স্যানিটারি ন্যাপকিন বা প্যাড নিয়ে এক ধরনের হীনমন্যতায় ভোগে। ২০১৮ সালের শেষ প্রান্তে এসেও পিরিয়ডকে অশুচি, খারাপ, লজ্জার, অত্যন্ত গোপন কোন ‘রোগ’ বলে মনে করে। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের মানসিকতা অনেক বেশি কনজারভেটিভ। ওরা পিরিয়ডকে রোগ মনে করে। মনে করে নারীর প্রতি আল্লাহর অভিশাপ আছে বলেই পিরিয়ড হয়। শহরের তুলনায় গ্রামের নারীরা পিরিয়ডকে অনেক বেশী গোপন করে চলে। এখনও ওষুধের দোকানে গিয়ে প্যাড কিনতে হলে প্যাডের কথা বলতে হলে দুইচার বার এদিকওদিক তাকাতে হয় মেয়ে বা মহিলাদের। আর ছেলেরাতো তা কখনই কিনতে চান না।

২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৬ ভাগ নারী মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার না করে পুরনো কাপড় বা ন্যাকড়া ব্যবহার করেন। এতে কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারেদের। সচেতন হবার পরও প্যাড ব্যবহার না করার পেছনে আসল কারণ প্যাডের দামটা। পিরিয়ডের সময় কাপড় ব্যবহার করা যাবে, তবে ব্যবহারের জন্য নেয়া কাপড়টি অবশ্যই পরিষ্কার হতে হবে। তারপর ব্যবহারের পর সেটি সাবান ও গরম পানি দিয়ে খুব ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর ইস্ত্রি করে কাপড়টি জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া কয়েকবার ব্যবহারের পর কাপড়টি ফেলে দিতে হবে। নইলে ইনফেকশনের আশঙ্কা থাকবে।
এদিকে নেত্রকোনা জেলায় বেসরকারি সংস্থা ডরপ কর্তৃক বাস্তবায়িত ঋতু প্রকল্পের (২০১৭) বেজলাইন সার্ভে রিপোর্টে প্রায় একই ধরণের ফলাফল প্রদর্শন করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টয়লেটের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং তাদের শিক্ষা বিষয়ক দক্ষতাকে প্রভাবিত করে। এটি আবার মানুষের মূল্যবোধ গঠনের উপর নেতিবাচক প্রভাব এবং বিপুল সংখ্যক মেয়ের অবদান দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে প্রভাব ফেলবে।

ডরপ এর গবষেণা পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান জানান, এডভোকেসি ধরণের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে মেয়েদের হাজিরা খাতা অনুযায়ী অনুপস্থিতির হার কমেছে, ফলে তারা তুলনামূলকভাবে ভালো শিক্ষা পাচ্ছে। বাজেট ট্র্যাকিং উদ্যোগের ফলে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ থেকে ওয়াশ খাতে বাজেট বরাদ্দকরণে বিদ্যালয়গুলোতে খুব ভালোভাবে সফল হয়েছে। আমরা আশা করছি, নেত্রকোনা জেলার লুব্ধ ফলাফলগুলো বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন এবং একটি মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ও ব্যবস্থাপনা বান্ধব সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন।

তথ্য সূত্র : http://www.dailysangram.com/post/361174-%E2%80%9C%E0%A6%9B%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%A4-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF-%E0%A6%93-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%A4-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E2%80%9D

Leave a Reply

Your email address will not be published.