কিশোরীর সুস্বাস্থ্য

This content was developed for Bangladeshi Nationals.

সপ্তম শ্রেণীর নাবিলার স্কুল চলাকালীন সময়ে পিরিয়ড হয়, বান্ধবীকে বলে দু’জন স্কুলের অফিস রুমে আসে। অফিস সহকারী হিসেবে যে দু’জন দিদি আছে তাদের কাছে প্যাড চায়, কিন্তু প্যাড নেই জানিয়ে দেয় (স্কুলের এই দিদিদের কাছে প্যাড থাকে, শিক্ষার্থীরা প্রয়োজন হলে দিদিদের কাছ থেকে নিতে পারে। অবশ্য সাথে সাথে প্রতি প্যাড ১০ টাকা করে নিতে হয়। কিন্তু সেদিন প্যাড শেষ হয়ে যায়)। নাবিলা অফিসের ফোন থেকে বাসায় মাকে কল করে, মায়ের মোবাইল বন্ধ পেলে বাবাকে কল করে। বাবা তখন অফিসে, বাবাকে বলেÑ যেভাবে হোক মাকে স্কুলে কল করতে বলো। বাবা খবর পৌঁছায় মায়ের কাছে, নাবিলার মা কল করে স্কুলে। ততক্ষণ নাবিলা স্কুলের অফিস রুমের পাশে সেবা কক্ষে অপেক্ষা করে। নাবিলার মাকে বিষয়টি বললে, তিনি মেয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আসেন। ঘটনাটি ২০১৮ সালের।

২০১৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন সার্ভে অনুযায়ী, প্রতি ১৮৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি টয়লেটের ব্যবস্থা। যার ফলে সেক্টর উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসডিপি) ২০১১-২০২৫ অনুযায়ী ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি টয়লেট সুপারিশ করেছে। গ্রামীণ এলাকায় (৪৩%) অর্ধেকের কম স্কুলে উন্নত এবং কার্যকরী টয়লেট ছিল যা মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা ছিল। মাত্র ২৪ শতাংশ স্কুল টয়লেট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাওয়া গিয়েছিল, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩২%) স্কুলে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল। শহর এলাকায় ৬৩ শতাংশ স্কুলে উন্নত ও কার্যকর টয়লেট যা মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা ছিল; ৪৭ শতাংশ স্কুলে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল।
কিন্তু মেয়েদের স্কুলে সঠিক মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-বান্ধব টয়লেট ও পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) সুবিধা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেটের পরিমাণ সরকারি পরিপত্র বা বিজ্ঞপ্তিতে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। যার ফলে স্কুলের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ফাইন্যান্সিং স্ট্র্যাটেজি ২০১৭ প্রণীত দলিলটিতে স্কুলের মধ্যে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন সুযোগ সুবিধার জন্য বিনিয়োগ সম্পর্কে কোনো পরিষ্কার নির্দেশনা না থাকায় মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে বিদ্যালয়ে বিনিয়োগ অনুপস্থিত।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০১৬-২০ ছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট এবং পর্যাপ্ত স্যানিটারি ন্যাপকিন ও পরিষ্কারের সুবিধা অন্তর্ভুক্তকরণের গুরুত্ব আরোপ করেন। উপরন্তু ২০১৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট ব্যবস্থাপনা, যার মধ্যে উন্নত সুবিধাসহ সাবান-পানির ব্যবস্থা, বিন এবং মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর মেয়েদের শিক্ষা দেয়ার জন্য নারী শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার জন্য সব মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৮৬ শতাংশ নারী মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার না করে পুরনো কাপড় বা ন্যাকড়া ব্যবহার করেন। এতে কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের।
এ দিকে নেত্রকোনা জেলায় বেসরকারি সংস্থা ডরপ কর্তৃক বাস্তবায়িত ঋতু প্রকল্পের (২০১৭) বেজলাইন সার্ভে রিপোর্টে প্রায় একই ধরনের ফলাফল প্রদর্শন করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টয়লেটের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং তাদের শিক্ষাবিষয়ক দক্ষতাকে প্রভাবিত করে। এটি আবার মানুষের মূল্যবোধ গঠনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব এবং বিপুল সংখ্যক মেয়ের অবদান দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে প্রভাব ফেলবে।

২০১৮ সালে ডরপ কর্তৃক এ বিষয়ে প্রণীত পলিসি ব্রিফে বেশ কিছু প্রস্তাবনা বা সুপারিশ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তুলে ধরা হয়েছে। কয়েকটি হচ্ছে সেক্টর উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসডিপি) ২০১১-২৫ এর নির্দেশনা অনুসারে, ১:১৮৭ এর পরিবর্তে ১:৫০ জন ছাত্রীর জন্য নতুন ও পৃথক টয়লেট তৈরি ও পরিচালনার জন্য বাজেট বরাদ্দে অবশ্যই স্কুলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি স্কুলে সাবান ও পানির পাশাপাশি হাত ধোয়ার স্থান রাখতে হবে, যাতে মেয়ে শিক্ষার্থীরা সেগুলো ব্যবহার করতে পারে। এসব ব্যবস্থাপনার বাস্তবায়ন রাখতে হলে নিয়মিত এগুলোকে কার্যকর ও রক্ষণাবেক্ষণ করা। চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)এর সাথে সাথে প্রাথমিক স্তরের পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) সুবিধাগুলো নিশ্চিতের জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং প্রাপ্যতার জন্য স্কুল লার্নিং ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যানে (এসএলআইপি) বাজেট বৃদ্ধি করা। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখা। এটি ছাত্রীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন বা চর্চা করতে সহায়তা করা।

জাতীয় মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা কৌশলপত্র নির্দিষ্ট প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ডরপের গবেষণা ও অনুশীলনে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার এবং অন্যান্য সেক্টরের সাথে লবিং ও অ্যাডভোকেসির ফলে নেত্রকোনা জেলার ৮৯টি বিদ্যালয়ে টয়লেট রিয়ালাইজেশন করার জন্য ঋতু প্রকল্প থেকে সর্বমোট খরচের মধ্যে ৬২৬০৮৯ টাকা (২০%) এবং বাকি ৮০ শতাংশের মধ্যে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি (২২%), ইউনিয়ন পরিষদ (২২%), উপজেলা পরিষদ (৮%), সেকেন্ডারি এডুকেশন অ্যাকসেস এনহেন্স প্রজেক্ট (সেকায়েপ) থেকে (২৮%) বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

ডরপের গবষেণা পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান জানান, অ্যাডভোকেসি ধরনের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে মেয়েদের হাজিরা খাতা অনুযায়ী অনুপস্থিতির হার কমেছে, ফলে তারা তুলনামূলক ভালো শিক্ষা পাচ্ছে। বাজেট ট্র্যাকিং উদ্যোগের ফলে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ থেকে ওয়াশ খাতে বাজেট বরাদ্দকরণে বিদ্যালয়গুলোতে খুব ভালোভাবে সফল হয়েছে। আমরা আশা করছি, নেত্রকোনা জেলার লুব্ধ ফলাফলগুলো বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং একটি মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ও ব্যবস্থাপনা-বান্ধব সমাজ গড়ে তুলবে।

তথ্য সূত্র : http://www.dailynayadiganta.com/women/380326/%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8B%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A7%8D%E0%A6%AF

Leave a Reply

Your email address will not be published.