ঋতুস্রাবে পুরনো কাপড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি

This content was developed for Bangladeshi Nationals.

দিনাজপুর সরকারি কলেজের স্নাতকের ছাত্রী নাবিলা (ছদ্মনাম)। স্নাতকে পড়ার সময়ই তিনি প্রথমবারের মতো ঋতুস্রাবের সময় ন্যাপকিন বা প্যাড ব্যবহার করার বিষয়টি জানতে পারেন। এর আগে তিনি পুরনো কাপড় ব্যবহার করতেন। এসব কাপড় একাধিকবার তিনি ব্যবহার করেছিলেন। এখনো তার গ্রামের মেয়েরা ন্যাপকিন বিষয়টার সঙ্গে তেমন পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি।

শুধু নাবিলাই নয়, দেশে এমন অসংখ্য নারী আছেন, যারা এই বিষয়টি লজ্জায় কিংবা শঙ্কায় বাইরে প্রকাশ করেন না।

নারীদের ঋতুস্রাব বা মাসিকের সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে দুই থেকে সাত দিন পর্যন্ত নারীদের রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা করতে অধিকাংশ নারী পুরনো কাপড় ব্যবহার করে থাকেন। সেটা যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তা জানেন না অনেক নারী। এতে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, মাসিকের সময় পুরনো কাপড় সর্বোচ্চ তিনবার ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ প্রতি দুই বা তিন মাস অন্তর নতুন কাপড় ব্যবহার করতে হবে। তা না করা হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে।

পুরনো কাপড়ের বদলে বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির ন্যাপকিন ব্যবহারের পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। কিন্তু বাংলাদেশের বহু গ্রামের নারীরা এখনো বিষয়টির ব্যাপারে অজ্ঞ।

কী কারণে নারীরা ন্যাপকিন ব্যবহার করছেন না, আর পুরনো কাপড়ই বা বারবার কেন ব্যবহার করেন? বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছিল কিছু নারীর কাছে। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন স্নাতকপড়ুয়া ছাত্রী ও গৃহিণী।

নীলফামারী সরকারি কলেজের তৃতীয় বর্ষের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্রী জান্নাতুন্নেসা (ছদ্মনাম)। মাসিক শুরুর আগে প্রতি মাসে পুরনো কাপড় কীভাবে সংগ্রহ করবেন, সে চিন্তা তাকে একসময় তাড়া করত। কিন্তু ন্যাপকিনের বিষয়টি জানার পর, সে চিন্তায় ছেদ পড়লে লজ্জা কিছুটা কেটেছে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সুমা আক্তার (ছদ্মনাম) নামের এক নারীর সাথে এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি প্রথমে বিষয়ে শেয়ার করতে না চাইলেও পরে অবশ্য অনেক বিষয় জানিয়েছেন।

এই নারী কিশোরগঞ্জ শহরে বড় হয়েছেন। কিন্তু তিনিও স্যানিটারি প্যাড সম্পর্কে ততটা ভালো জানতেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বান্ধবীদের মারফতে প্রথম জানা। তখন থেকে ন্যাপকিন ব্যবহার করেন। তবে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যেতেন, সে সময় বিপাকে পড়তে হতো।

সুমা জানান, দুই ভাই-বোনের মধ্যে ভাই নবম শ্রেণিতে পড়ত। এ কারণে তাকে সেটা কেনার জন্য দোকানে পাঠাতে লজ্জা করতেন। ফলে মাসিকের সময়গুলোতে পুরান কাপড়ে ছিল তার ভরসা। আর বিয়ের পর স্বামীকে সেটা কিনে আনতে বলার জন্য লজ্জা কাজ করে তার।

কথা হচ্ছিল রাজধানীর একটি স্বনামধন্য স্কুলের এক ছাত্রীর সঙ্গে। দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া ওই ছাত্রী জানায়, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার ঋতুস্রাব শুরু হয়। সে সময় তাকে পুরান কাপড় ব্যবহার করতে হতো। বান্ধবীদের মুখে ন্যাপকিন ব্যবহারের কথা শুনলেও তাদের কাছে তা চাইতে পারত না। এ কারণে প্রতি মাসে টিফিনের টাকা জমিয়ে একটি করে ন্যাপকিন কিনত সে।

ওই ছাত্রী জানায়, তার ক্লাসের অনেক বান্ধবী ঋতুস্রাবের সময় ক্লাসে আসে না। তাদের অনেকে এখনো পুরনো কাপড় ব্যবহারে অভ্যস্ত। বিষয়টি নিয়ে ক্লাসের শিক্ষিকারারও তেমন কোনো ধরনের সচেতনতামূলক কথাবার্তা বলেন না।

বিবাহিত নারীদের কয়েকজন জানান, সারা মাস চিন্তামুক্ত থাকলেও ঋতুস্রাবের সময়টাতে চিন্তায় থাকতে হয় তাদের। কারণ সে সময়ে তারা যে কাপড়টি ব্যবহার করেন, তা শুকাতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে কাপড় রাখার আলনার পেছনে, বেডের নিচের ফাঁকা অংশে বা বারান্দায় শুকাতে হয়। আর কাপড়টি যে ভালো ডিটারজেন্ট বা জীবাণুনাশক সাবান দিয়ে ধুয়ে রাখতে হয়, সেটাও অজানা তাদের কাছে। মাসিকের এক কাপড় অনেকে মাসের পর মাস ব্যবহার করেন।

রংপুর সদর উপজেলার টার্মিনাল এলাকার বাসিন্দা এক নারী বলেন, ‘মাসিকের পর থেকে আজ পর্যন্ত পুরান কাপড় ব্যবহার করে চলছি। কই কখনো তো কেউ জানাইল না, সেটা ঝুঁকিপূর্ণ। এখন আবার শুনতেছি সেটা নাকি সমস্যা করে!’

মাসিকের সময় পরিষ্কার অন্তর্বাস, পরিষ্কার প্যাড বা ন্যাপকিন ব্যবহার, নিয়মিত গোসল করা, মাসিকের ব্যবহৃত কাপড়টি সাবান ও ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে কড়া রোদে শুকানো, প্যাড পরিবর্তনের সময় সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়া, সাবান ছাড়া হালকা কুসুম পানি দিয়ে যৌনাঙ্গ ধুয়ে ফেলা এবং সর্বদা যৌনাঙ্গ শুকনো রাখার বিষয়গুলো অধিকাংশ নারী জানে না বলে জানান কিছু চিকিৎসক।

পুরান কাপড় কতটা ঝুঁকিপূর্ণ জানতে চাওয়া হয়েছিল বিষয়টি নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন রেড অরেঞ্জের হেড অব প্রোগ্রামস নকীব রাজীব আহমেদের কাছে। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ঋতুকালীন সময়ে পুরনো ও অপরিষ্কার কাপড় তিন মাসের বেশি ব্যবহার যে একজন নারীর স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা অনেকেই জানে না। বাংলাদেশের নারীরা বিষয়টি সম্পর্কে এখনো অনেক অজ্ঞ। তবে এর জন্য সবাইকে সচেতন করতে সবার কাজ করা উচিত।’

নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন চিকিৎসক এলভিনা মুসতারী। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, পুরনো কাপড় ঠিকমতো না ধুয়ে ও না শুকিয়ে ব্যবহারে প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ হতে পারে। সাধারণত ফাঙ্গাস ইনফেকশন ও চুলকানি হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে সংক্রমণের শেষ পর্যায় বন্ধ্যাত্ব হতেও পারে।

পুরনো কাপড় ব্যবহারের কারণ হিসেবে মুসতারী বলেন, অনেকের অসচেতনতা, অজ্ঞতা ও আবার অনেকের ইচ্ছাশক্তি থাকলে পুরনো কাপড় ব্যবহার করে থাকেন। তা ছাড়া অনেকে অার্থিক অবস্থার কারণে এটি করে থাকেন। তবে ওই সময়টাতে প্রজননতন্ত্রের সংক্রামক এড়াতে সব নারীকেপরিষ্কার কাপড় সঠিকভাবে ধুয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করতে এবং তিন মাস পরপর পরিবর্তন করতে হবে অথবা যেকোনো ভালো কোম্পানির স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হবে।

Source: https://www.priyo.com/articles/menstrual-cloths-have-higher-health-risks-in-menstruation-201805251706/

Leave a Reply

Your email address will not be published.